বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী :-মাত্র কয়েক বছর আগেও যিনি পায়খানার স্লাব বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, কিংবা যার বাবা মাছ বিক্রি করে সংসার চালাতেন—আজ তিনি কয়েক শ কোটি টাকার মালিক! কোনো আলাদিনের চেরাগ নয়, বরং মরণনেশা হেরোইনের আন্তর্জাতিক কারবার করে ফুলেফেঁপে উঠেছে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের দিয়াড় মানিক চক (মহিশালবাড়ী) এলাকার জহুরুল মেম্বারের সম্পদ। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষ ছড়িয়ে জহুরুলের এই জিরো থেকে হিরো বনে যাওয়ার গল্প এখন পুরো রাজশাহী জুড়ে ‘টক অব দ্য টাউন’।
কী আছে জহুরুল মেম্বারের ‘সাম্রাজ্যে’?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক ব্যবসার কালো টাকায় জহুরুল মেম্বার গড়ে তুলেছেন এক বিশাল সাম্রাজ্য। তার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদের বিবরণ চোখ কপালে তোলার মতো।
মহিশালবাড়ী ডাঙ্গাপাড়া, কালিদিঘি ও দিগ্রামে রয়েছে বিঘার পর বিঘা ধানী জমি। আচুয়া সি এন্ড বি এলাকায় রয়েছে ৩ বিঘার বাগানসহ নিজস্ব প্লট। রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে বহুতল বিলাসবহুল বাড়ি। এছাড়া রাজশাহী সিটি হাটের পাশেই রয়েছে ৩টি নিজস্ব দামী প্লট ও বিশাল বাগান বাড়ি।একাধিক বিলাসবহুল মাইক্রোবাস ও পণ্যবাহী ট্রাক। রয়েছে নিজস্ব ইটভাটা, বিশাল ওয়ার্কশপ ও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
অর্থ পাচারকে বৈধতা দেওয়ার জন্য রয়েছে দুটি স্বর্ণের দোকান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এই মাদক সম্রাট একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও প্রতিবারই জামিনে বেরিয়ে এসে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী মডেল থানা ও ডিবিতে মাদকের একাধিক মামলা রয়েছে।
জহুরুল মেম্বারের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর মামলার বিবরণীতে রয়েছে, গোদাগাড়ী মডেল থানা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন মামলা নং-৩২, মামলা নম্বর ১৬৫৯ ৩/১, জেলা গোয়েন্দা শাখার মামলায় নম্বর ৭৩৮, গোদাগাড়ী মডেল থানার মামলা নং-৪৮।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার ‘মাসোহারা’ আর মদদেই জহুরুলের এই রমরমা মাদক সিন্ডিকেট টিকে রয়েছে। তার হয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে বিশাল এক ‘বহনকারী’ বা ‘কুলার’ বাহিনী।
শুধু জহুরুল মেম্বারই নন, গোদাগাড়ীকে হেরোইনের ট্রানজিট পয়েন্ট বানিয়ে আরও একঝাঁক গডফাদার ও চুনোপুঁটি মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। জহুরুলের নেটওয়ার্কসহ গোদাগাড়ীর উল্লেখযোগ্য মাদক কারবারিদের একটি তালিকা প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে।
গোদাগাড়ীর উল্লেখযোগ্য মাদক কারবারি ও সিন্ডিকেট সদস্যরা হলেন,সিএনবির শীষ মোহাম্মদ, মাদারপুরের মোঃ তারেক, রেলগেটের সেতাবুর রহমান ওরফে বাবুসহ, জহিরুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম, আব্দুর রহিম টিপু, মেহেদী হাসান, ফরিদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, ইলিয়াস আলী, সোহেল রানা, মনিরুল ইসলাম, মাসুদ রানা, রবিউল ইসলাম, এজাজুল হক ঝাবু, রবিউল ইসলাম ওরফে রবি, নওশাদ আলী, জাহাঙ্গীর আলম, মো. সেলিম, মিজানুর রহমান, মো. হযরত আলী, সাহাবুদ্দীন, নাজিবুর রহমান, মো. তোফাজ্জল হোসেন, হায়দার আলী, আবুল কালাম আজাদ, ইসাহাক আলী, সোহেল, আবদুল্লাহ, জিয়ারুল ইসলাম,শামীম হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন মোফা, জাহাঙ্গীর, রাকিবুর রহমান, তরিকুল ইসলাম, মোছা. আজিজা বেগম, আবদুল আলিম (কালু), গোলাম মোস্তফা টিয়া, তোফায়েল হোসেন, কারিমা,নবীন, মাইকেল, মো. মিলন, দুরুল হোদা, রাজা, আনারুল ইসলাম, মাসুম, রুমেন ইসলাম, আজিজুল ইসলাম, শহীদুল ইসলাম ভোদলসহ শতাধিক মাদক কারবারি।
জহুরুল মেম্বার ও তার সহযোগীদের এই রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার পেছনে মূল জ্বালানি হলো যুবসমাজকে ধ্বংসকারী ‘হেরোইন’। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এত তৎপরতার পরও এই মাদক সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর কোথায়? কেন বারবার ধরা পড়ার পরেও জামিনে এসে তারা একই ব্যবসা দ্বিগুণ উৎসাহে চালিয় যায়?
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে জহুরুল মেম্বারসহ এই তালিকার প্রত্যেকের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে সীমান্ত ঘেঁষা এই অঞ্চলকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা যায়।
এ বিষয় জানতে জহুরুল মেম্বারকে ফোন দেওয়া হলে তার ব্যবহৃত ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ কারণে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে কথা রাজশাহী জেলা পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আমরা মাদকের গডফাদারদের তালিকা অনুযায়ী তদন্ত করছি। একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে কাজ করছে। তদন্ত পূর্বক গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কথা বললে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রাজশাহী জেলার উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, মাদক কারবারিদের নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। আমাদের তালিকায় এদের অনেকের নাম রয়েছে। অভিযানের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে গোদাগাড়ীর আব্দুল্লাহ ও তারেক নামের দুই ব্যক্তির সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে ।
