সিন্ধু নদের পানি রহস্য: সংকটের আড়ালে কি তবে বড় কোনো ‘অব্যবস্থাপনার অপরাধ’?

বিশেষ ইনভেস্টিগেটিভ টিম | ঢাকা

সিন্ধু নদের পাড়ে কান পাতলে এখন শুধু পানির হাহাকার নয়, বরং এক রহস্যময় ‘চুরি’ ও ‘ষড়যন্ত্রের’ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই সংকটের গোড়ায় যখন আমরা অনুসন্ধান চালালাম, তখন বেরিয়ে এল এক চমকপ্রদ সত্য। তথ্য-উপাত্ত বলছে, সিন্ধু নদে পানির কোনো অভাব নেই; বরং আছে প্রাচুর্য। তবুও কেন কৃষকের মাঠ শুকিয়ে কাঠ? কেন বারবার আঙুল তোলা হচ্ছে উজানের দিকে? আমাদের ইনভেস্টিগেশনে উঠে এসেছে এক পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনার চিত্র [১]।

**১. ‘নিখোঁজ’ পানির রহস্য: সাগরে যাচ্ছে কোটি কোটি গ্যালন**
তদন্তের প্রথম সূত্রটি পাওয়া যায় পাকিস্তানের করাচির কোটরি ব্যারাজে। ২০২৫ সালের খরিফ মৌসুমে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) সিন্ধু নদে প্রত্যাশার চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি পানি প্রবাহিত হয়েছে। পাকিস্তানের নিজস্ব সংস্থা IRSA-এর তথ্যমতে, প্রত্যাশিত ১০৪ MAF পানির বিপরীতে প্রকৃতি অকৃপণভাবে দিয়েছে ১২২.৩৬ MAF [২]।

তাহলে রহস্যটা কোথায়? আসল রহস্য লুকিয়ে আছে সাগরে। এই খরিফ মৌসুমে প্রায় **৩০.৮৪৮ MAF পানি ব্যবহার না করেই আরব সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে**, যা গত পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি [৩]। এমনকি রবি মৌসুমেও প্রায় ৩.৬ MAF পানি সাগরে বয়ে গেছে [৩]। প্রশ্ন হলো, যদি সত্যিই উজানের দেশ পানি ‘চুরি’ করত বা সংকট তৈরি করত, তবে এত বিপুল পরিমাণ জলরাশি সাগরে বিসর্জন দেওয়া কি সম্ভব হতো?

২. জলাধারের লুকোচুরি ও মিথ্যা ‘অজুহাত’**
আমাদের অনুসন্ধানের দ্বিতীয় সূত্র হলো পাকিস্তানের বিশাল জলাধারগুলো। দাবি করা হয়েছিল, উজানের হস্তক্ষেপে জলাধারগুলো পূর্ণ হচ্ছে না। কিন্তু সরকারি রেকর্ড বলছে অন্য কথা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ পাকিস্তানের প্রধান জলাধারগুলো তাদের ধারণক্ষমতার প্রায় **৯৯ শতাংশ পূর্ণ ছিল** [৪]। এমনকি আগামী ২০২৬ সালের জন্যও প্রচুর পানি হাতে রেখেই বছর শেষ হয়েছে [৫]।

চেনাব নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার পেছনে কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ নয়, বরং হিমালয়ের তুষারপাত ও তাপমাত্রার খামখেয়ালিপনাই দায়ী—যা একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া [৫]।

**৩. বাগলিহার প্রকল্প: আন্তর্জাতিক ক্লিনচিট ও আর্থিক লোকসানের ঝুঁকি**
ভারতের বাগলিহার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে প্রায়ই খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক ‘নিউট্রাল এক্সপার্ট’ এই প্রকল্পের নকশাকে সিন্ধু পানি চুক্তির সাথে সংগতিপূর্ণ বলে রায় দিয়েছেন [৭]।

সবচেয়ে বড় তথ্য হলো, পানি আটকে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখলে সংশ্লিষ্ট দেশেরই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয় [৮]। একটি সাধারণ পলি অপসারণ বা ফ্ল্যাশিং চক্রের কারণে প্রায় **১৫ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়**, যার ফলে সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয় [৮]। কোনো দেশ কি রাজনৈতিক কারণে নিজের এত বড় আর্থিক ক্ষতি করবে? তথ্য বলছে, এই ফ্ল্যাশিং অপারেশনগুলো সম্পূর্ণ কারিগরি কারণে করা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয় [৮]।

**তদন্তের উপসংহার: অপরাধী কে?**
আমাদের এই দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, সিন্ধু নদের মূল শত্রু কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং পাকিস্তানের নিজস্ব **অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জলাধারের অভাব এবং অদক্ষ বন্টন ব্যবস্থা** [৩], [৯]। নিজেদের এই দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা এবং অব্যবস্থাপনার ‘অপরাধ’ আড়াল করতেই ‘পানির অভাব’ বা ‘কৃত্রিম সংকট’-এর এক ধোঁয়াশা তৈরি করা হচ্ছে [৯]।

সত্যিটা হলো, সিন্ধু নদে পানি আছে প্রচুর, শুধু তা ধরে রাখার সামর্থ্য নেই অববাহিকাটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। আর এই অব্যবস্থাপনার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ কৃষকদের।

*সূত্র: সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান জনাব অতুল জৈন-এর প্রতিবেদন [১-৯]*

 

Chief Editor

Johny Watshon

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat. Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur

Quick Links