‘হকের পানি’: সিন্ধু নদের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতের নতুন কৌশল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ​নয়াদিল্লি: সিন্ধু জল চুক্তি (Indus Waters Treaty) নিয়ে ভারতের অবস্থানে এক বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন কেন্দ্রীয় জল কমিশনের (CWC) প্রাক্তন চেয়ারম্যান অতুল জৈন। গত বছর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর করা মন্তব্য—“হকের পানি ভারতীয় কৃষকদের কাজে লাগবে”—উদ্ধৃত করে তিনি জানান, এটি ভারতের কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সংযমের একটি প্রয়োজনীয় সংশোধন।

​১৯৬০ সালে সিন্ধু জল চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ভারত উজান দেশ (Upper Riparian) হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত উদারতা দেখিয়েছিল। ভারত সিন্ধু নদ ব্যবস্থার মাত্র ২০% পানি নিজের জন্য রেখে বাকি ৮০% পানি পাকিস্তানকে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়। আশা ছিল, এই ঔদার্যের জবাবে পাকিস্তানও দায়িত্বশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করবে। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই সদিচ্ছার কোনো প্রতিফলন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি।
​”রক্ত এবং পানি একসঙ্গে বইতে পারে না”
​সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদের কারণে দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। পুলওয়ামা এবং পাহলগামসহ কাশ্মীরের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমাগত সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সেই বিখ্যাত উক্তি—“রক্ত এবং পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না”—আজ আর কেবল কথার কথা নয়। অতুল জৈনের মতে, কোনো চুক্তিই চরম বৈরিতার মুখে বছরের পর বছর ধরে অটুট থাকতে পারে না।
​পানির অপচয় ও কাঠামোগত অসঙ্গতি
​চুক্তির অন্যতম বড় ত্রুটি হলো, এটি ভারতের পানি ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করলেও, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পানির দক্ষ ব্যবহারের কোনো বাধ্যবাধকতা রাখেনি।
​সেচ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে প্রায় ৪৭ MAF (Million Acre-Feet) পানির অপচয় হচ্ছে।
​সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রায় ৩৫ MAF পানি অব্যবহৃত অবস্থায় আরব সাগরে গিয়ে পড়ছে।
​অথচ ভারতের রাজস্থান ও হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলো তীব্র পানির সংকটে ভুগছে এবং কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

​বাগলিহার এবং সালাল-এর মতো ভারতীয় প্রকল্পগুলোতে পলি জমার কারণে পানি ধারণক্ষমতা ও কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে। বাঁধের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য ‘ফ্লাশিং’ (পলি পরিষ্কার) প্রক্রিয়াটি পাকিস্তানের অযৌক্তিক আপত্তি এবং আইনি মারপ্যাঁচের কারণে বছরের পর বছর বিলম্বিত হয়েছে। ভারত এখন আর এই ধরনের রাজনৈতিক নাটকের কাছে জিম্মি থাকবে না। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভারত তার পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে অব্যাহত রাখবে।

​অতুল জৈনের মতে, ভারতের এই নতুন অবস্থানের তিনটি মূল ভিত্তি রয়েছে:
পানি সংকটে থাকা ভারতীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য বরাদ্দ পানির সম্পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
একপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও অপচয় এবং অন্যপক্ষের ওপর অযৌক্তিক বিধিনিষেধের দ্বিমুখী নীতি আর মেনে না নেওয়া।
বাঁধ ও পরিকাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ভারতের প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখা।
“হকের পানি” কোনো আগ্রাসী হুমকি নয়, বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নীতিগত সংশোধন। দশকের পর দশক ধরে ভারত যে ধৈর্য দেখিয়েছে, তার অবসান ঘটিয়ে এখন নিজের কৃষক, জনগণ এবং দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে ভারত তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

Next Post

সিন্ধু নদের পানি রহস্য: সংকটের আড়ালে কি তবে বড় কোনো ‘অব্যবস্থাপনার অপরাধ’?

বুধ জুলাই ১৫ , ২০২৬
বিশেষ ইনভেস্টিগেটিভ টিম | ঢাকা সিন্ধু নদের পাড়ে কান পাতলে এখন শুধু পানির হাহাকার নয়, বরং এক রহস্যময় ‘চুরি’ ও ‘ষড়যন্ত্রের’ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই সংকটের গোড়ায় যখন আমরা অনুসন্ধান চালালাম, তখন বেরিয়ে এল এক চমকপ্রদ সত্য। তথ্য-উপাত্ত বলছে, সিন্ধু নদে পানির কোনো অভাব নেই; বরং আছে প্রাচুর্য। তবুও […]

Chief Editor

Johny Watshon

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat. Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur

Quick Links