রাজশাহীতে হেরোইন আত্মসাতে বাহককে হত্যা :মামলায় পুলিশকে বাঁচাতে বিলম্বিত চার্জশিট

নিজস্ব প্রতিবেদক :- রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে হেরোইন আত্মসাতের ঘটনায় রফিকুল ইসলাম (৩২) নামের এক বাহককে হত্যা মামলার পাঁচ বছর পার হলেও এখনও চার্জশিট জমা হয়নি। মূল আসামি হিসেবে পুলিশের পাঁচ সদস্যের নাম উঠে এলেও তারা কেউ গ্রেফতার হয়নি। বরং মামলার তদন্ত থেমে আছে এবং তদন্ত কর্মকর্তার বদলি জনিত কারণে পরিবার আশঙ্কা করছে, পরিকল্পিতভাবে সময় নষ্ট করে আসামিদের বাঁচানো হচ্ছে। এ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচারের শঙ্কায় রয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটে ২০২০ সালের ২১ মার্চ রাতে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসাহাক আলী ইসাকে নিয়ে পুলিশের একটি বিশেষ টিম গোদাগাড়ী সীমান্তবর্তী এলাকায় হেরোইন জব্দের অভিযানে যায়। অভিযানে গিয়ে পুলিশ ও মাদক কারবারী জামাল, রফিকুলের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।এক পর্যায়ে পুলিশ রফিকুলকে বেধরক মারধর করে।এতে রফিক মাটিতে লুটিয়ে পরে। পরে পুলিশ সদস্যরা রফিকের নাকে শ্বাস চেক করে মৃত্যু নিশ্চিত হয়।

পরদিন ২২ মার্চ পদ্মার চরে রফিকুলের লাশ উদ্ধার উদ্ধার করে থানা পুলিশ। তারা এটিকে “বজ্রপাতজনিত মৃত্যু” হিসেবে অপমৃত্যু মামলায় নথিভুক্ত করে।

পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দেখা যায়—মৃত্যুর কারণ বজ্রপাত নয়, রফিকুলের শরীরে ছিল মারধরের চিহ্ন। একই বছরের ১৭ জুন রফিকুলের স্ত্রী রুমিসা খাতুন শরিফুল ইসলাম পিতা আব্দুল মালেককে সন্দেহ করে থানায় হত্যা মামলা করেন। এরপর মামলার তদন্তভার দেয়া হয় পিবিআই রাজশাহীর হাতে। মামলা হতেই জড়িত আসামিদের নাম প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।

দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা যায় , আলাতুলি ইউনিয়ন এলাকার শান্তিপাড়া গ্রামের আশরাফের ছেলে শরীফ মুর্শিদাবাদ জেলার কাশেমের কাছ থেকে হেরোইন ক্রয় করে এবং বর্ডার থেকে সংগ্রহ করে পৌছে দেয় আসামী জামাল ও ভিকটিম রফিকের কাছে।এরপর জামাল ও রফিক মাদকগুলো ইসাহাক আলী ইসার কাছে পৌছে দেওয়ার কথা। এরই মধ্যে বুদ্ধি আঁটেন ইসা। পুলিশের সাথে যোগসাজশ করে মাদকগুলো আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করেন তারা।পরিকল্পনা অনুযায়ী গোদাগাড়ীর উজানপাড়া ঘাট সংলগ্ন এলাকায় জামাল ও রফিককে ধরে ফেলে পুলিশ। শুর হয় ধস্তাধস্তি। পরে পুলিশ রফিককে বেধড়ক পিটিয়ে মেরে ফেলেন।

তদন্তের সময় ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর গ্রেফতার হন ইসাহাক আলী (ইসা) নামের এক ব্যক্তি। আদালতে স্বীকারোক্তিতে ইসা জানান, অভিযানে অংশ নেয়া পাঁচ পুলিশ সদস্য রফিকুলকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে এবং হেরোইনের মালামাল নিজেরাই আত্মসাৎ করে। স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে জড়িত পুলিশ সদস্যদের নাম এরা হলেন, গোদাগাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান, এসআই আবদুল মান্নান, এসআই রেজাউল ইসলাম, কনস্টেবল শাহাদাত হোসেন ও কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের নাম।

অভিযোগ রয়েছে, হত্যার পর ওই পাঁচ পুলিশ সদস্য হত্যায় জড়িত জামালকে পরিকল্পিত ভাবে ১ শ গ্রাম মাদক মামলায় আসামি করে রফিকুলকে পালাতক দেখান। পরদিন তার লাশ উদ্ধার করে বজ্রপাত জনিত কারনে মারা যাওয়ার কথা বলে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে স্বীকারোক্তি, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং প্রাথমিক প্রমাণ থাকার পরও পাঁচ বছর ধরে চার্জশিট জমা হয়নি। সম্প্রতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় আরও সময়ক্ষেপণ হচ্ছে বলে অভিযোগ পরিবার ও স্থানীয়দের।

রফিকুলের স্ত্রী রুমিসা খাতুন অভিযোগ করেন, “যারা আমার স্বামীকে চরে মারল, তারাই তাকে মামলায় আসামি বানিয়েছে। মামলা স্পষ্ট হলেও পাঁচ বছরেও চার্জশিট নেই। তদন্তের নামে সময় নষ্ট করা হচ্ছে, যাতে অভিযুক্ত পুলিশদের বাঁচানো যায়।”

রুমিসা খাতুন আরও বলেন, “সরকার সত্যিকারের বিচার চান কিনা তার প্রমাণ হবে চার্জশিটে। আমরা শুধু চাই—আমার সন্তানের বাবা যেন হত্যাকারীদের হাতে লজ্জাজনকভাবে চাপা না পড়ে।”

রফিকুলের বাবা ফজলুর রহমান আরও বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে প্রাণ নিয়ে ভয়। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে শুধু ঘুরছি, তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়, কথার স্বর বদল হয়—অন্যদিকে খুনিরা বদলি হয়ে শান্তিতে চাকরি করছে।”

পরিবারের দাবি, পিবিআই ইচ্ছাকৃতভাবে নতুন নাটক সাজানোর চেষ্টা করছে। মাঝে নতুন করে সাধারণ জনগণকে অভিযুক্ত করার গল্প শোনা যাচ্ছে, যাতে প্রকৃত অপরাধী পুলিশ সদস্যদের ধামাচাপা দেওয়া যায়।

এদিকে, মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন—পুলিশ সদস্যদের জড়িত থাকা মামলাগুলো ‘স্বার্থরক্ষার জালে’ দীর্ঘকাল ঝুলে থাকে। ফলে প্রভাবশালীদের চাপ এবং পুলিশি প্রভাব বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন—জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত ও তদন্তের প্রাথমিক প্রমাণ একসঙ্গে থাকার পরও চার্জশিট জমা না দেয়ার অর্থ “অভিযুক্তদের আইনি সুরক্ষা দেয়া।” পাঁচ বছর কাটলেও ন্যূনতম বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।

পরিবার বলছে—“বিচার নয়, সময়ের খেলা চলছে।”পাঁচ বছর পরও চার্জশিট জমা না হওয়া সেই অভিযোগকেই জোরালো করে তুলছে। আদালতের কাগজপত্র হাতে পেলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায়, প্রশ্ন এখন—রফিকুল কি বিচারহীনতার আরেকটি নাম হয়ে যাবে?

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, পূর্বেই পিবিআই এর এস আই জামাল মামলা প্রায় শেষ করলেও বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা অজ্ঞাত কারণে মামলা ফেলে রেখেছে। তিনি নতুন করে ফন্দি আঁটতে ব্যস্ত। নির্দোষ কিছু ব্যক্তিকে ফাঁসাতে তাঁদের কাছে অর্থ দাবি করছেন।
জানতে চাইলে রাজশাহী পিবিআই এর মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক উদয় কুমার মন্ডল বলেন, মামলাটি তদন্তধীন আছে। এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না। এছাড়াও মামলাটি আমি ৬ মাস হলো দ্বায়িত্ব পেয়েছি। আসামী শরীফুল ছাড়া কারো বাসায় আমি যায়নি। অর্থ দাবির বিষয়ে প্রশ্নই উঠে না।

একাধিকবার ফোন দিলেও পিবিআই এর এসপি মনিরুল ইসলাম ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর অফিসে গেলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠো ফোনে বার্তা দিলেও তিনি রিপ্লে করেনি।

Next Post

রাজশাহীতে জাতীয় সাপ্তাহিক আইন সমাজ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধিদের মাঝে আইডি কার্ড বিতরন

সোম ডিসে. ৮ , ২০২৫
নিজেস্ব প্রতিনিধি:ঢাকা থেকে ৩৪ বছর ধরে প্রকাশিত সরকারী নিবন্ধনকৃত জাতীয় সাপ্তাহিক আইন সমাজ পত্রিকার রাজশাহী জেলার সকল উপজেলা প্রতিনিধিদের মাঝে আইডি কার্ড(পরিচয়পত্র) বিতরন করা হয়েছে। সোমবার সকাল ১১ ঘটিকার সময় রাজশাহী মহানগরীর  অফিসে আইডি কার্ড বিতরন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সাপ্তাহিক আইন সমাজ পত্রিকার রাজশাহী ব্যুরো প্রধান তানজিজুল ইসলাম লাইকের সঞ্চালনায় […]

এই রকম আরও খবর

Chief Editor

Johny Watshon

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat. Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur

Quick Links