রাকাবে আধিপত্যের অবসান, সংস্কারে ফিরছে শৃঙ্খলা

নিজস্ব প্রতিনিধি: রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) দীর্ঘদিনের আধিপত্য ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের অবসানে সংস্কার প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ এডহক অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রত্যাখ্যান করে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি এক সাধারণ সভায় ৩৮৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় এবং ১১৩ সদস্যের প্রধান কার্যালয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, উত্তরবঙ্গের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে রাকাব। তিন হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর শ্রমে পরিচালিত ব্যাংকটি ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সরকারের বিভিন্ন কৃষি প্রকল্প ও প্রণোদনা বাস্তবায়নে কাজ করছে। সম্প্রতি সরকারের সঙ্গে কৃষিখাতের বিভিন্ন প্রণোদনা বাস্তবায়নে চুক্তিও করেছে ব্যাংকটি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের আওতায় দুই লাখ ৪০ হাজার কৃষক পরিবারকে ঋণমুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে রাকাব। কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাতেও শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর ব্যাংক সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হলে একটি গোষ্ঠীর আধিপত্য ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ সামনে আসে। এডহক অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের ছত্রছায়ায় কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যাংক ব্যবস্থাপনাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।এ পরিস্থিতিতে প্রধান কার্যালয়ের এডহক কমিটির আহ্বায়ক ও ডিজিএম মো. মিজানুর রহমান পদত্যাগ করেন। পরে যুগ্ম আহ্বায়ক ডিজিএম মো. শাহিনুর ইসলামকে কোনো নোটিশ ছাড়াই বহিষ্কার করা হয়েছে- এমন অভিযোগও ওঠে।

এ ঘটনায় এডহক কমিটির সদস্যসহ সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। একপর্যায়ে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ সভার মাধ্যমে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ডিজিএম মো. মিজানুর রহমানকে সভাপতি ও ডিজিএম মো. শাহিনুর ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে ব্যাংকের ওপর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আধিপত্যের অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার কর্মপরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিজিএম মো. আবুল কালামের নামও এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন তিনি ব্যাংকটির কেন্দ্রীয় অফিসের আইসিটি বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভাগটির ওপর প্রভাব বিস্তার করেন।

তিনি ২০১০ সালে ICT বিভাগে চাকুরীতে যোগদানের পরে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ডিজিএম পদ পেয়ে যান। বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকার সমর্থিত কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে তিনি ICT বিভাগে আধিপত্য বিস্তার করেন। ICT তে সিস্টেম এবং অপারেশন বিভাগ নামে ২টি বিভাগ এবং ২ টি ডিজিএম পদ থাকলেও তিনি ফ্যাসিষ্ট সরকারের মদদপুষ্ট হওয়ার কারণে কোনভাবেই অন্য ডিজিএমকে পদায়ন করতে দেননি। তিনি অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে একাই ২টি বিভাগের দায়িত্বে থেকেছেন। ৫ আগস্ট এর পর তৎকালীন ব্যাংক ব্যবস্থাপনা তার আধিপত্য রোধ করে সমভাবে ২টি বিভাগ ২ জন ডিজিএম এর দায়িত্বে দেওয়ার উদ্যোগ নিলে তিনি তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন। পরে দেবনাথ আত্মসম্মান রক্ষার্থে তিনি বদলি নিয়ে চলে যান।

পরবর্তীতে এমডির দায়িত্ব পেয়ে ওয়াহিদা বেগম যোগদান করেন রাকাবে। তিনি ICT বিভাগকে আপারেশন এবং সিস্টেম বিভাগকে পৃথক করে মো. আবুল কালাম ডিজিএমকে অপারেশন বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি নাখোশ হন। এয়ে এমডি ওয়াহিদা বেগম এর সাথেও সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন- প্রথমতঃ বিভাগ আলাদা করে আধিপত্য কমে যাওয়া।দ্বিতীয়ত অপারেশন বিভাগে বড় কেনা কাটার কোন সুযোগ নেই। এই ক্ষোভে তিনি এমডি ওয়াহিদা বেগমকে হেনস্থা করার জন্য পত্রিকায় বানোয়াট তথ্য প্রকাশ করতেন। একসময় চাপের মুখে তিনিও বদলি নিয়ে চলে যান। ডিজিএম আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের সময় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এই দুর্নীতির কারণে তার নামে দুদকের একটি অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া তিনি ICT সিস্টেম বিভাগ হতে অপারেশন বিভাগের দায়িত্বে আসার পর সিস্টেম বিভাগের কয়েক কোটি টাকার বিলের কমিশন হাতছাড়া হওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।

আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব খাটিয়ে তিনি একই বিভাগে ১৫ বছর কর্মরত ছিলেন। বিগত স্বৈরাচারী সরকার এবং বর্তমান সরকারের আমলে রাকাব অফিসার্স এসোসিয়েশনের কোন পদে না থেকেও সুকৌশলে তিনি প্রভাব বিস্তার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল অর্থ উপার্জন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ডিজিএম আবুল কালাম এর অন্যতম সহযোগি হলেন মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেল ,মূখ্য কর্মকর্তা,ব্যবস্থাপক ,পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার শাখায় বদলির আদেশপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের সময় অফিসার্স ফোরামের সহ সাংগঠনিক পদে বহাল ছিলেন। স্বৈরাচার সরকার পতনের পর তিনি ভোল্ট পাল্টে এডহক অফিসার্স এসোসিয়েশনের পদে অধিষ্ঠিত আছেন।

ফলে রাকাবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তিনিও খোলস পাল্টে ফেলায় দল তথা প্রতিষ্ঠানের জন্য হুমকি স্বরূপ। রাশেদুল ইসলাম রাশেল ব্যাংকের বিভিন্ন বিশৃঙ্খলায় নেপথ্যে কাজ করেন বলেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয় গত ০৭ আগস্ট ডিজিএম আবুল কালাম এবং মূখ্য কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলামের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রংপুরের কিছু উছৃঙ্খল কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে মব সৃষ্টির মাধ্যমে হেনস্হার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত রাশেদুল ইসলাম রাশেলের বক্তব্য পাওয়া না গেলেও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিজিএম আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘আমি রাকাবে আইসিটি বিভাগে ছিলাম। আমি ২০১০ সালে যোগদান করেছিলাম। আমার ১৫-১৬ বছর ওই বিভাগে থাকা নিয়ে কোনো অনিয়ম নেই। আমার মতো আরও অনেক কর্মকর্তা আছেন, যারা আমার আগে যোগদান করে ১৮ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে ওই বিভাগে আছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটা বেনামে করা অভিযোগ। একই অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকেও করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় আমাকে অব্যাহতি দিয়েছে। একই বিষয়ে এখন দুদকের তদন্ত চলছে। ২০২২ সালের একটি ক্রয়সংক্রান্ত অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ব্যাংকের অনলাইন কার্যক্রম, ডাটা সেন্টার ও সিবিএস সফটওয়্যার ক্রয়ের সময় থেকেই একটি চক্র বিভিন্ন সময়ে এসব কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে।’

সাবেক এমডি নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ ও ওয়াহিদা বেগমের সঙ্গে তার বিরোধের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘সাবেক এমডি নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ বা ওয়াহিদা বেগমের সঙ্গে আমার কোনো খারাপ সম্পর্ক ছিল না। আমি তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। ব্যক্তিগত কোনো বিরোধও ছিল না।’

কমিটি গঠন প্রসঙ্গে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমাদের একটি মূল কমিটি হয়েছে। পরে কোনো সাধারণ সভা বা নির্বাচন ছাড়াই একটি পক্ষ নিজেদের মতো করে আরেকটি কমিটি তৈরি করে ফেসবুকে প্রচার করেছে। এটা কোনো নিয়মতান্ত্রিক কমিটি নয়। বেআইনিভাবে কমিটি গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা ওই কমিটি করেছে, তাদের একজন পদত্যাগ করেছেন এবং আরেকজন সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রাতারাতি ওই কমিটি তৈরি করেছে।’

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাকাবের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দূর করে একটি পেশাদার ও ব্যাংকবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। আধিপত্যের অবসান, অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাব রোধ, সিনিয়রদের প্রতি সম্মান এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সংস্কারের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনার এসব পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের প্রত্যাশা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করে রাকাবকে উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতির আরও শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে।

শিরোনাম

Chief Editor

Johny Watshon

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat. Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur

Quick Links